ঢাকা, ৩ আগস্ট ২০২৬ (বাসস) : ২০২৬ সালের কমনওয়েলথ গেমস আয়োজন করে শেষ মুহূর্তে আসরটিকে রক্ষা করেছে গ্লাসগো। তবে গত ১০ দিনে মাত্র ১০টি খেলাকে নিয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে আয়োজন করা এই আসরও ইভেন্টটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হওয়া সংশয় দূর করতে পারেনি।
৯৬ বছর আগে ব্রিটিশ এম্পায়ার গেমস নামে প্রথম আয়োজিত এই ক্রীড়া আসর ২০২৩ সালে সংকটে পড়ে। ঐ সময় অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্য ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে আয়োজক হওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়ায়।
২০১৪ সালের কমনওয়েলথ গেমস আয়োজন করা গ্লাসগো তখন বিদ্যমান ভেন্যুগুলো ব্যবহার করে কম খরচে আয়োজনের সমাধান দেয়। মাত্র ১৬ কোটি পাউন্ড বাজেটে এবারের গেমস আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে চার বছর আগে বার্মিংহামে খরচ হয়েছিল ৭৮ কোটি পাউন্ড।
চার বছর পর শতবর্ষী কমনওয়েলথ গেমস আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছে ভারতের আহমেদাবাদ। তখন ইভেন্টের পরিসর আবারও বাড়িয়ে ১৫ থেকে ১৭টি খেলা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
২৩তম কমনওয়েলথ গেমস কেমন হলো এবং আধুনিক ক্রীড়াঙ্গনে এই আসরের ভবিষ্যৎ আদৌ আছে কি না, তা নিয়ে এএফপি স্পোর্টসের বিশ্লেষন : 'দরজা খুলে দেওয়ার মতো'
অলিম্পিক গেমসের দুই বছর আগে বা পরে অনুষ্ঠিত হওয়ায় কমনওয়েলথ গেমস প্রায়ই ভবিষ্যৎ তারকাদের নিজেদের মেলে ধরার মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে। কমনওয়েলথ স্পোর্টের সভাপতি ড. ডোনাল্ড রুকাওে বলেন, "কমনওয়েলথ গেমসেই চ্যাম্পিয়ন তৈরি হয়।"
গেমসের অন্যতম আকর্ষণীয় ইভেন্ট ১০০ মিটারে স্বর্ণ জয়ের পর ক্যামেরুনের ইমানুয়েল এসেমে বলেন, চার বছর আগে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেমসই অভিজাত পর্যায়ে তার ক্যারিয়ারের সূচনা করে দিয়েছিল।
স্কটল্যান্ডের ভেজা আবহাওয়া উপেক্ষা করে ৯.৮৩ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করার পর এসেমে বলেন, "কমনওয়েলথ গেমস আমার জন্য দরজা খুলে দেওয়ার মতো ছিল। গত কমনওয়েলথ গেমসে জাতীয় রেকর্ড ১০.০৮ সেকেন্ড করার পরই সবকিছু এগোতে শুরু করে। আমার দেশের কেউ কখনো ভাবেনি ক্যামেরুনের কেউ ১০.০৮ সেকেন্ডে দৌড়াতে পারবে। আমি কমনওয়েলথ গেমসেই সেটা করেছি। এটা দারুণ ছিল এবং এরপর থেকেই সবকিছু ভালোভাবে এগিয়েছে।"
১৭১টির বেশি পদক জিতে পদক তালিকার শীর্ষে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, যার মধ্যে ছিল ৭০টি সোনা। এরপর রয়েছে ইংল্যান্ড, কানাডা ও ভারত।
তবে ৭৪টি দেশ ও অঞ্চলের এই আসরটি ছোট ও তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত দেশগুলোর জন্য নিজেদের তুলে ধরার বড় সুযোগ। গ্লাসগো থেকে জার্সি, ডমিনিকা ও ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জও স্বর্ণপদক নিয়ে ফিরেছে।
ডমিনিকার অলিম্পিক ট্রিপল জাম্প চ্যাম্পিয়ন থিয়া লাফন্ড বলেন, "আমার সবকিছুর শুরু এখান থেকেই এবং সম্ভবত এখানেই এর সমাপ্তিও হবে। ডমিনিকার জন্য পথপ্রদর্শক হতে পারাটা দারুণ অনুভূতি।"
কমনওয়েলথ গেমস কিছু ক্রীড়াবিদকে এমন দেশ বা অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগও দেয়, যারা অলিম্পিক বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অন্যদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে অংশ নেয়।
২৭ বছরের পুরোনো মাইল দৌড়ের বিশ্বরেকর্ড ভেঙে আসায় ঘরের মাঠের গেমসের পোস্টারবয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিলেন জশ কের। স্কটিশ এই অ্যাথলেট প্রত্যাশা পূরণ করে ৬০ বছর পর কমনওয়েলথ গেমসে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত মাইল দৌড়ে দাপুটে পারফরম্যান্সে স্বর্ণ জেতেন।
কের বলেন, "গ্রেট ব্রিটেনের জাতীয় সংগীতের বদলে 'ফ্লাওয়ার অব স্কটল্যান্ড' বাজানো- এটা একেবারেই আলাদা। আমার ক্যারিয়ারে এমন সুযোগ আর খুব বেশি পাব না।"
'ফ্রেন্ডলি গেমস' হিসেবে পরিচিত এই আসরের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র আরও জোরদার হয়েছে সর্বকালের সবচেয়ে বড় প্যারা-স্পোর্টস কর্মসূচির মাধ্যমে। অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিকের মতো আলাদা না করে ছয়টি প্যারা-স্পোর্ট পুরোপুরি মূল আসরের সঙ্গে একীভূত করা হয়েছে।
'তারকাদের অনুপস্থিতি ও ফাঁকা গ্যালারি'
কমনওয়েলথ স্পোর্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কেটি স্যাডলিয়ার গেমসের ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। ২০৩৪ সাল ও তার পরের আসর আয়োজনের ব্যাপারে নিউজিল্যান্ডের নেতৃত্বে আরও কয়েকটি সম্ভাব্য আয়োজক দেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
তবে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে সফল বিডও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত না হওয়ার নজির রয়েছে।
এটি টানা দ্বিতীয় কমনওয়েলথ গেমস, যেখানে আয়োজক পরিবর্তন করতে হয়েছে। এর আগে ২০২২ সালের গেমস আয়োজনের দায়িত্ব থেকে ডারবানও সরে দাঁড়িয়েছিল।
প্রথমবারের মতো অলিম্পিক আয়োজনে ভারতের উচ্চাকাঙ্খা আহমেদাবাদের প্রার্থিতার অন্যতম চালিকাশক্তি। তবে শতবর্ষী আসর পার হওয়ার পর কমনওয়েলথ গেমস আয়োজনের অর্থ জোগানোর প্রেরণা কোথা থেকে আসবে তা অনেকটাই অস্পষ্ট।
ক্রীড়াবিদদের কাছে গেমসটির আকর্ষণ কমে যাওয়ার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে গ্লাসগোতে যারা অংশ নেননি, তাদের তালিকায়।
ব্রিটিশ অ্যাথলেটিকসের সবচেয়ে বড় তারকা কেরের পাশাপাশি কিলি হজকিনসনও গেমসটিতে না এসে আসন্ন ইউরোপিয়ান অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
নারীদের ১০০ মিটারে অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন জুলিয়েন আলফ্রেড এবং কানাডার সাঁতারের বিস্ময় সামার ম্যাকইনটোশও গেমসটি এড়িয়ে যাওয়া বড় নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন।
তারকা ক্রীড়াবিদদের অনুপস্থিতির প্রভাব পড়েছে দর্শক উপস্থিতিতেও। ১২ বছর আগে একই শহরে যেখানে ১৩ লাখ টিকিট বিক্রি হয়েছিল, তার বিপরীতে এবার পরিবেশ ছিল অনেকটাই নিষ্প্রভ এবং গ্যালারির অনেক আসনই ছিল ফাঁকা।
গ্লাসগো আপাতত কমনওয়েলথ গেমসকে রক্ষা করেছে ঠিকই, তবে এই আসরের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা বা ভবিষ্যৎ কোনোভাবেই নিশ্চিত নয়।








