ঢাকা, ৪ নভেম্বর, ২০২৬ : দুই দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। ঘরের মাঠে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই টুর্নামেন্ট আয়োজনের সুযোগ পেলেও শুধু স্বাগতিক হওয়ার সুবিধা দিয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।
আগামী ৫ থেকে ১৭ নভেম্বর ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ।
২০০৩ সালে ঘরের মাঠে নিজেদের প্রথম ও একমাত্র সাফ শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। ২০০৫ সালেও ফাইনালে উঠেছিল দলটি। তবে এরপর ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। পরবর্তী কয়েকটি আসরে গ্রুপ পর্বের বাঁধাও পেরোতে পারেনি তারা।
দীর্ঘ বিরতির পর আবারও বাংলাদেশে ফিরছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। ফলে ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশাও অনেক বেশি।
তবে ঘরের মাঠে খেলার সুবিধার পাশাপাশি পরিচিত পরিবেশ ও দর্শকদের অকুণ্ঠ সমর্থন পাওয়ার সুযোগ থাকলেও প্রত্যাশার চাপ সামলানোর চ্যালেঞ্জও রয়েছে খেলোয়াড়দের সামনে।
পাঁচটি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে খেলা জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার ও তারকা স্ট্রাইকার জাহিদ হাসান এমেলি বাসসের সঙ্গে আলাপকালে আঞ্চলিক শিরোপা পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, “এবার বাংলাদেশের ভালো সুযোগ রয়েছে, অনেক ভালো সুযোগ। আমরা স্বাগতিক দেশ এবং আমাদের দলে মানসম্পন্ন খেলোয়াড় রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে সাফের শিরোপা জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে দারুণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।”
হামজা চৌধুরী ও শামিত সোমের মতো আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রবাসী ফুটবলারদের অন্তর্ভুক্তি জাতীয় দলের শক্তি ও সামর্থ্য বাড়িয়েছে।
তবে কাগজে-কলমে শক্তিশালী দল থাকলেই হবে না, মাঠে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের ওপরই সাফল্য নির্ভর করবে বলে সতর্ক করেছেন এমেলি।
তিনি বলেন, “শর্ত একটাই, খেলোয়াড়দের মাঠে পারফর্ম করতে হবে। ইন্দোনেশিয়ায় সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সসহ অন্যান্য ম্যাচের ফল বিবেচনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ আদৌ প্রত্যাশা অনুযায়ী খেলতে পারবে কি না। সাফ একেবারেই ভিন্ন ধরনের টুর্নামেন্ট। এখানে চ্যাম্পিয়ন হতে হলে নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে হবে।”
ঘরের মাঠে বড় টুর্নামেন্টে খেলার মানসিক চাপের বিষয়টিও তুলে ধরেন এমেলি। তার মতে, লাখো সমর্থকের প্রত্যাশা খেলোয়াড়দের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
পাঁচটি সাফ আসরে খেলার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ভালো দল ও স্বাগতিক সুবিধা থাকলেই সাফল্য নিশ্চিত হয় না, “সাফে অনেক সময় মনে হয়, শিরোপা জেতাটা যেন আমাদের নিয়তি- ভালো দল আছে, ঘরের মাঠের সুবিধা আছে, সবকিছুই অনুকূলে। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরু হলে বাস্তবতা পুরোপুরি বদলে যায়। পুরো দেশ যখন সাফের দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন চাপ তৈরি হয়। দলের কতজন খেলোয়াড় এই চাপ সামলে পারফর্ম করতে পারবে? দু-একজন ছাড়া এমন চাপের মধ্যে নিজেদের সেরা খেলাটা দেখানো সত্যিই কঠিন।”
বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার পেছনে ঘন ঘন কোচ পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন সাবেক এই স্ট্রাইকার।
এমেলির মতে, দীর্ঘ সময় একজন কোচকে দায়িত্বে রাখলেই সাফল্য নিশ্চিত হয় না। কারণ জাতীয় দলের ফুটবলে তাৎক্ষণিক ফল দেওয়ার প্রত্যাশা থাকে, “দীর্ঘ সময় একজন কোচকে দায়িত্বে রাখাই মূল কথা নয়। জাতীয় দলের ফুটবলের ধরনই এমন যে এখানে খুব বেশি সময় পাওয়া যায় না। জাতীয় দলে তাৎক্ষণিক ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। এটি সিনিয়র পর্যায়ের ফুটবল। ধীরে ধীরে দল পুনর্গঠন বা উন্নতির জন্য খুব বেশি সময় থাকে না। বিশ্ব ফুটবলের বাস্তবতা এটাই। শেষ পর্যন্ত কোচ পরিবর্তনও প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কোনও কোচ সাফল্য দিতে না পারলে পরিবর্তন আসবেই।”
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ফুটবলে ধারাবাহিক সাফল্য না পাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হিসেবে ঘরোয়া ফুটবলের নিম্নমানকে চিহ্নিত করেছেন এমেলি।
২০০৩ সালে সাফ চ্যাম্পিয়ন এবং ২০০৫ সালে রানার্সআপ হওয়ার সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করে তিনি বলেন, ঘরোয়া লিগ তার প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ চরিত্র ও দর্শকপ্রিয়তা অনেকটাই হারিয়েছে।
তিনি বলেন, “আমাদের ঘরোয়া লিগের মান খুবই খারাপ। এ কারণেই জাতীয় দল বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। ২০০৩ সালে যখন আমরা সাফ জিতেছিলাম কিংবা ২০০৫ সালে ফাইনালে উঠেছিলাম, তখন ঘরোয়া লিগ ছিল প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ এবং মানুষের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। এখন লিগের মান নেই, মাঠের অবস্থা খারাপ এবং খেলোয়াড়দের পারফর্ম করার প্রেরণাও কম।”
গত দুই দশক ধরে আলোচনা চললেও যুব ও তৃণমূল পর্যায়ের ফুটবলের উন্নয়নে বাস্তব অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।
এমেলি বলেন, “গত ২০ বছর ধরে আমরা যুব ফুটবল কাঠামো, তৃণমূল পর্যায় এবং ক্লাবগুলোর বয়সভিত্তিক দল নিয়ে আলোচনা করে আসছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তবে কোনও পরিবর্তন হয়নি। এসব ভিত্তি শক্তিশালী না হলে নতুন প্রতিভা উঠে আসবে না।”
মানসম্পন্ন স্থানীয় গোলদাতার সংকটও জাতীয় দলের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আক্রমণভাগ শক্তিশালী করতে দলটি ক্রমেই প্রবাসী ফুটবলারদের ওপর নির্ভর করছে। তবে শুধু কয়েকজন খেলোয়াড়কে দলে অন্তর্ভুক্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির জন্য মানসম্পন্ন ফুটবলার তৈরি এবং দলীয় ঐক্য প্রয়োজন বলে এমেলি গুরুত্বারোপ করেন।
ঘরের মাঠে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের শিরোপা জয়ের অভিযানে দলীয় ঐক্য, চাপের মুখে স্থিরতা এবং গোলের সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
লাখো ফুটবলপ্রেমীর একটাই প্রত্যাশা, ২০০৩ সালের সাফল্যের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে আবারও সাফ ট্রফি ঘরে তুলবে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।





