ঢাকা, ১০ আগস্ট ২০২৬ (বাসস) : ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) যৌথভাবে এক চিঠিতে ঘোষণা করেছে, ফুটবল "কোনো এক ব্যক্তির সম্পত্তি নয়"।
ফিফার প্রতিযোগিতাগুলো, যার মধ্যে বিশ্বকাপও রয়েছে, সেখানে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা প্রকাশের পর থেকেই ইনফান্তিনো তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। পরিকল্পনাটি প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি তা প্রত্যাহার করে নেন।
শনিবার ফিফা পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বলেছিল, ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ইনফান্তিনোকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য কিছু পক্ষের সমন্বিত ও চলমান প্রচেষ্টা চলছে।
তবে ইউরোপ, উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং এশিয়ার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর যৌথ চিঠি থেকে স্পষ্ট হয়েছে, ইনফান্তিনোর সমালোচকরা পিছু হটছেন না।
চিঠিতে বলা হয়েছে, "ফুটবলে নেতৃত্ব কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এটি ক্ষমতা ধরে রাখা অথবা ক্ষমতা নিজের হাতে রাখার দাবি জানানোর বিষয়ও নয়।"
কনফেডারেশন তিনটি আরও বলেছে, "প্রতারণার মাধ্যমে যখন আস্থা নষ্ট হয়, যখন কোনো ব্যক্তি তাকে যে সম্মিলিত কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব দিয়েছে, তার ঊর্ধ্বে নিজেকে স্থান দেন, তখন সেই দায়িত্ব পরিত্যক্ত হয়।"
ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেছিল এই তিন কনফেডারেশন এবং পরিকল্পনাটি স্থগিত হওয়ার পরও তারা অবস্থান থেকে সরে আসেনি।
কনকাকাফ সভাপতি ভিক্টর মন্তাগলিয়ানিকে ইনফান্তিনার সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী মার্চে রাবাতে অনুষ্ঠিত ফিফা সভাপতি নির্বাচনে চতুর্থ ও শেষ মেয়াদে প্রার্থী হওয়ার কথা ইনফান্তিনোর।
প্রার্থীদের ১৮ নভেম্বরের মধ্যে নিজেদের প্রার্থিতা ঘোষণা করতে হবে।
বেসরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি দিয়েছিল উয়েফা। এর ফলে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন এবং ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো দলগুলো প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে উয়েফার এই হুমকি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই বিতর্কের আগে ইনফান্তিনোকে প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত সফল বিশ্বকাপের তদারকি করেছিলেন তিনি।
৫৬ বছর বয়সী সুইস ইনফান্তিনো গত ১০ বছর ধরে ফিফার নেতৃত্বে রয়েছেন। তিনি আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (সিএএফ)-এর সমর্থন পেয়েছেন। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবলও মূলত তার পক্ষেই রয়েছে।
তবে কনফেডারেশনগুলো একক ব্লক হিসেবে ভোট দেয় না। কনকাকাফ, মেক্সিকো এবং এএফসির দুই সদস্য- কুয়েত ও ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক কাতার থেকেও ইনফান্তিনোর পক্ষে সমর্থনের কথা শোনা গেছে। কাতারে ইনফান্তিনোর একটি বাড়িও রয়েছে।
যদিও প্রস্তাবটি এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে কার্যত বাতিল হয়ে পড়ে আছে, উয়েফা একে "জীর্ণ, অস্বচ্ছ ও নেপথ্যে করা চুক্তি" হিসেবে অভিহিত করেছিল। তবু কনফেডারেশনগুলো ইনফান্তিনোর বিচারবোধের অভাব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
তারা বলেছে, "ফিফার সাম্প্রতিক চিঠিতে ভাইস-প্রেসিডেন্ট এবং ২১১টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনকে জানানো হয়েছে যে প্রক্রিয়াটিতে ভুল হয়েছে। এতে বিষয়টিকে যোগাযোগের ব্যর্থতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ ফুটবল যা প্রত্যক্ষ করেছে, তা ছিল বিচারবোধের ব্যর্থতা।"
গত সপ্তাহে মরক্কোয় ডাকা জরুরী বৈঠকে ফিফার শীর্ষ পরিচালকদের কাছ থেকে ইনফান্তিনো পূর্ণ সমর্থন পেলেও কনফেডারেশনগুলো বলেছে, এর কোনো অর্থ নেই।
তারা বলেছে, "সাম্প্রতিক এই বৈঠকে ফিফা ম্যানেজমেন্ট কমিটির পূর্ণ সদস্যদের নয়, বাছাই করা কয়েকজন সদস্যকে বিদেশে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। ফিফার কেন্দ্রস্থল ও কর্মীদের সমস্যা মোকাবিলা করতে নেতৃবৃন্দের জুরিখে যাওয়ার পরিবর্তে এমন পদক্ষেপ শুধু আমাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে এবং যে ধরনের আচরণ আমাদের এই পরিস্থিতিতে নিয়ে এসেছে, সেটিরই ধারাবাহিকতা প্রকাশ করেছে।"
"এটি কোনওভাবেই একজন অভিভাবকের আচরণ নয়। বরং এমন একজনের আচরণ, যিনি মনে করেন খেলাটি তার কাছেই জবাবদিহি করবে।"
৪৮টি দল নিয়ে আয়োজিত সর্ববৃহৎ বিশ্বকাপের ব্যাপক সাফল্যের পর এর সাফল্যের রেশ উপভোগ করছিলেন ইনফান্তিনো। তবে কনফেডারেশনগুলো চিঠিতে স্পষ্ট করেছে, এই সাফল্য শুধু ইনফান্তিনোর একার কারণে হয়নি।
তারা বলেছে, "গত এক দশকে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তা বাস্তব। কিন্তু এই অগ্রগতি কখনোই কোনো একজন ব্যক্তির কাজ ছিল না। এটি ছিল ফিফা, কনফেডারেশন, সদস্য অ্যাসোসিয়েশন এবং খেলাটির জন্য জীবন উৎসর্গ করা হাজারো মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। বর্ধিত পরিসরের টুর্নামেন্ট, ২০৩০ ও ২০৩৪ সালের ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজক নির্বাচন এবং সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর মধ্যে সম্পদের বণ্টন, সবই ছিল সম্মিলিত অর্জন। এগুলো একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।"
চিঠির শেষাংশে কনফেডারেশনগুলো দাবি করেছে, ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে যেখানে জবাবদিহি থাকা উচিত, সেখানে নীরবতা। যেখানে উন্মুক্ততা থাকা উচিত, সেখানে দূরত্ব বিরাজ করছে।
তারা আরও বলেছে, "এই কারণেই আমরা এই অবস্থান নিয়েছি, হালকাভাবে নয়, একা নয়; বরং একসঙ্গে, যে খেলাটির সেবা করি, তার প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে। ফুটবলের শক্তি সবসময়ই তার ঐক্যের মধ্যে নিহিত।"








