ঢাকা, ২০ জুলাই ২০২৬ (বাসস) : এটি ছিল এমন একটি বিশ্বকাপ, যেখানে ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকারা নিজেদের জাদু ছড়িয়ে টুর্নামেন্টকে আলোকিত করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত শিরোপা উঠেছে পুরোপুরি প্রাপ্য হিসেবেই শক্তিশালী দল স্পেনের হাতে। দলের প্রাণভোমরা লামিন ইয়ামাল তাঁর সেরা ছন্দে না থাকলেও দলটি ছিল প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনার তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী।
১৯ বছর বয়সী উইঙ্গার ইয়ামালকে ঘিরেই ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচনা। কিন্তু শুরুতে তিনি পুরোপুরি ফিট হতে পারেননি এবং পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল করেন, যা এসেছিল গ্রুপ পর্বে সৌদি আরবের বিপক্ষে জয়ে।
৪৮ দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপটিতে প্রতি ম্যাচে গড়ে ২.৯৬টি গোল হয়েছে, যা ১৯৭০ সালের পর এটিকে সবচেয়ে বেশি গোলসমৃদ্ধ বিশ্বকাপে পরিণত করেছে।
স্পেন আট ম্যাচে মাত্র ১৪টি গোল করেছে। রোববার মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অতিরিক্ত সময়ে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা নিজেদের করে নেয় লা রোজারা।
পুরো ম্যাচজুড়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার উপর ছড়ি ঘোরালেও দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে তাদের অপেক্ষা করতে হয় অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোলটি পর্যন্ত।
স্পেনের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল তাদের অসাধারণ রক্ষণভাগ। পুরো টুর্নামেন্টে তারা মাত্র একটি গোল হজম করেছে, সেটিও কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে। সেই রক্ষণকে দুর্দান্তভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন অধিনায়ক রদ্রি। তাই লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা অন্য কোনো আক্রমণভাগের সুপারস্টারের পরিবর্তে তিনিই টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন।
২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের স্মৃতি ফিরে আসে এই পারফরমেন্সের মাধ্যমে। ঐ আসরে দুর্ভেদ্য রক্ষণভাগকে ভিত্তি করে স্পেন প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতেছিল।
রিয়াল মাদ্রিদে চেলসি থেকে সদ্য যোগ দেওয়া ঝাকড়া চুলের ফুল-ব্যাক মার্ক কুকুরেয়া বলেন, "আপনি যদি গোল না খান, তাহলে জেতা অনেক সহজ হয়ে যায়। আমরা সবাই মিলে আক্রমণ করি, সবাই মিলে রক্ষণ সামলাই। এটাই এই দলের অন্যতম বড় শক্তি।"
বিশ্বকাপে ১৯৬২ সালের পর প্রথম দল হিসেবে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন দেখলেও মেসির আর্জেন্টিনা ফাইনালে একটিও শটও টার্গেটে নিতে পারেনি। সেমিফাইনালেও স্পেন ফ্রান্সের দুর্দান্ত আক্রমণভাগকে গোলশূন্য রেখেছিল। যদিও কিলিয়ান এমবাপ্পে ১০ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন।
স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন মজা করে বলেন, "এই বিশ্বকাপে আমি যে গ্লাভসগুলো পরেছি, সেগুলোর সঙ্গে কথা বলতে পারলে ওরাই বলত, তাদের খুব বেশি কাজই করতে হয়নি।"
গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে এমবাপ্পের পর ছিলেন আট গোল করা লিওনেল মেসি। এরপরের স্থানগুলোতে ছিলেন জুড বেলিংহাম, আর্লিং হালান্ড, বর্তমান ব্যালন ডি'অরজয়ী ওসমানে দেম্বেলে এবং হ্যারি কেন।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর অনেকেই ছিলেন এই তালিকায়। কিন্তু তাদের কোনো দলই স্পেনের সমকক্ষ হতে পারেনি। স্পেনই প্রথম দেশ যারা একই সময়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এর আগে তারাই ২০০৮ ও ২০১০ সালে এই কৃতিত্ব গড়েছিল।
ভবিষ্যৎও স্পেনের জন্য সমান উজ্জ্বল। ইয়ামাল ও তাঁরই সমবয়সী ১৯ বছর বয়সী পাউ কুবার্সি এখন সেই অভিজাত তালিকার সদস্য, যেখানে কিশোর বয়সে বিশ্বকাপ জেতা খেলোয়াড়ের সংখ্যা মাত্র ১০ জন।
২০২২ বিশ্বকাপে শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেওয়ার হতাশার পর স্পেনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন কোচ লুইস ডি লা ফুয়েন্তে। ৬৫ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ কোচ অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন। স্পেনের সাথে তাঁর চুক্তি রয়েছে ইউরো ২০২৮ পর্যন্ত।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আসা খ্যাতিমান কোচদের নিয়েই ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচনা। কার্লো আনচেলত্তি ব্রাজিল এবং টমাস টাচেল ইংল্যান্ডের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। অন্যদিকে মোরিসিও পোচেত্তিনো যুক্তরাষ্ট্রকে কেবল শেষ ষোলো পর্যন্ত নিতে পেরেছেন, আর জুলিয়ান নাগেলসম্যানের জার্মানিও হতাশ করেছে।
গত দুই দশকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে 'আজীবন সম্ভাবনাময় কিন্তু ব্যর্থ' দলের তকমা পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলেছে স্পেন। ২০০৮ সালের পর থেকে তারা জিতেছে দুটি বিশ্বকাপ, তিনটি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং একটি উয়েফা নেশন্স লিগ।
মাত্র দুই মাস পরই ইংল্যান্ড ও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে নেশন্স লিগের ম্যাচ দিয়ে আবার মাঠে নামবে স্পেন।
তবে আপাতত তারা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দ উপভোগ করবে এবং ২০৩০ সালে শিরোপা ধরে রাখার রোমাঞ্চকর সম্ভাবনার কথা ভাববে। সেটিই হবে বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দলের নিজ দেশের মাটিতে শিরোপা রক্ষার অভিযান।








