নারীর স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ শুধু স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নয়। এটি মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও ভবিষ্যতের জন্য একটি বিনিয়োগ বলে মন্তব্য করেছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
নারীস্বাস্থ্য, মা ও নবজাতকের জীবন রক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনী স্বাস্থ্য অর্থায়নের অগ্রাধিকার নিয়ে জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে (World Health Summit) আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে বাংলাদেশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, গবেষক, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, দাতা সংস্থা এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতের প্রতিনিধিসহ চার হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী এ সম্মেলনে যোগ দেন।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান। প্রতিনিধিদলে ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার এবং অধ্যাপক ডা. শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল—ইউএনএফপিএর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং এবং যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য অধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডা. আবু সাঈদ মোহাম্মদ হাসান প্রতিনিধিদলকে সহযোগিতা করেন।
সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের মূল লক্ষ্য ছিল জাতীয় অঙ্গীকারকে টেকসই বিনিয়োগে রূপান্তর, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জোরদার এবং নারী ও কিশোরীদের জীবনব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া।
নারীস্বাস্থ্য উন্নয়নে ২৫ কোটি ইউরোর বিনিয়োগ
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (ইআইবি) ২৫ কোটি ইউরোর একটি ঋণ নারীস্বাস্থ্য উদ্যোগে ব্যবহারের বিষয়ে ঘোষণা। ২০২৭ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী ও কিশোরীকে এ উদ্যোগের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য মাতৃমৃত্যু ও মাতৃস্বাস্থ্যজনিত জটিলতা কমানো, মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা এবং জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ, স্ক্রিনিং, শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণ করা।
সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ইউএনএফপিএ এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে কারিগরি সহায়তা দেবে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকে কার্যকর, টেকসই ও সবার জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবায় রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের একটি আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনেও এ উদ্যোগ গুরুত্ব পায়। সেখানে ইউএনএফপিএর নির্বাহী পরিচালক দিয়েন কেইটা জাতীয় নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনী উন্নয়ন অর্থায়নের মাধ্যমে নারীস্বাস্থ্য এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতির জন্য বাংলাদেশ সরকারকে প্রশংসা করেন।
‘দ্য মোমেন্ট ইজ নাউ: আনলকিং নিউ ক্যাপিটাল ফর উইমেনস হেলথ বিয়ন্ড এইড’ শীর্ষক ইউএনএফপিএর উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে ডা. জুবাইদা রহমান নারীস্বাস্থ্য খাতে প্রচলিত উন্নয়ন সহায়তার পাশাপাশি নতুন ধরনের অর্থায়ন এবং বৈশ্বিক অংশীদারত্ব জোরদারের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “নারীস্বাস্থ্যে বিনিয়োগ কেবল স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় নয়।” তাঁর মতে, নারীস্বাস্থ্যে বিনিয়োগ মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য মৌলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জাতীয় অঙ্গীকার, স্বল্পসুদে অর্থায়ন, অনুদানভিত্তিক কারিগরি সহায়তা এবং টেকসই অভ্যন্তরীণ সম্পদের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন। কিশোরীদের রক্তস্বল্পতা ও মাতৃপুষ্টির ঘাটতি মোকাবিলা থেকে শুরু করে প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু কমানো এবং প্রাণঘাতী ক্যানসার মোকাবিলা—নারীর জীবনচক্রের প্রতিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
মিডউইফারী সেবা সম্প্রসারণে স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা ও দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব
বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণের আরেকটি দিক ছিল স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রীর ‘ফ্রম ক্রাইসিস টু রেজিলিয়েন্স: সাউথ-সাউথ পার্টনারশিপস ফর মিডওয়াইফারি অ্যাক্সেলারেশন অ্যান্ড হেলথ সিকিউরিটি’ শীর্ষক মন্ত্রী পর্যায়ের প্রাতরাশ বৈঠকে অংশগ্রহণ। বার্লিনের ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের এলিজাবেথ ব্ল্যাকওয়েল স্যালনে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী, জাতিসংঘের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বৈঠকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন নিরাপদ মাতৃত্ব, সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং মানসম্মত প্রসূতিসেবা নিশ্চিত করতে পেশাদার মিডউইফারীসেবা সম্প্রসারণের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ নিয়োগ ও পদায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে গর্ভকালীন সেবা, নিরাপদ প্রসব, জরুরি অবস্থায় উন্নত কেন্দ্রে রেফারেল এবং প্রসব-পরবর্তী সেবার ধারাবাহিকতা আরও শক্তিশালী হবে।
মন্ত্রী বলেন, মিডউইফারী সেবায় বিনিয়োগকে নিছক ব্যয় হিসেবে নয়, বরং উচ্চ সুফলদায়ক জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। তিনি স্বাস্থ্য খাতে দেশীয় অর্থায়ন ক্রমান্বয়ে বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের লক্ষ্যের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ জিডিপির ১ দশমিক ০২ শতাংশ।
দেশের ৬২টি ধাত্রীশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিকায়নের উদ্যোগও তুলে ধরেন মন্ত্রী। এ লক্ষ্যে সিমুলেশনভিত্তিক শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান এবং দক্ষতাভিত্তিক ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণে সম্পদ সংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো, প্রশিক্ষণ শেষে মিডওয়াইফরা যেন নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও জীবনরক্ষাকারী সেবা দিতে প্রয়োজনীয় বাস্তব দক্ষতা অর্জন করেন।
মন্ত্রী নেপাল ও পাকিস্তানের সঙ্গে চলমান অভিজ্ঞতা বিনিময়সহ দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, অভিন্ন ক্লিনিক্যাল নির্দেশিকা, শিক্ষক বিনিময় এবং যৌথ শিক্ষণ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশগুলো নিজস্ব প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সাশ্রয়ী ও কার্যকর ধাত্রীসেবার মডেল গড়ে তুলতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ ও মানবিক সংকটের সময়ও প্রয়োজনীয় প্রজনন ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখতে মিডওয়াইফদের ভূমিকা তুলে ধরেন তিনি। বাংলাদেশের বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় সংকটের মধ্যেও জীবনরক্ষাকারী সেবা সচল রাখতে মিডওয়াইফরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ প্রসব এবং ধর্ষণ-পরবর্তী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতেও তাঁরা সামনের সারিতে কাজ করছেন।
যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য অধিকার এবং ধাত্রীসেবার অগ্রগতিতে ইউএনএফপিএর ধারাবাহিক কারিগরি সহায়তা ও বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রশংসা করেন মন্ত্রী।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও কমিউনিটিভিত্তিক সেবা জোরদার
সম্মেলনে বাংলাদেশের বৃহত্তর বার্তা ছিল—নারীস্বাস্থ্যের উন্নয়ন শুধু হাসপাতাল ও বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, সহজলভ্য কমিউনিটিভিত্তিক সেবা, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী এবং কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা অপরিহার্য।
সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে এক লাখ কমিউনিটি ও ওয়েলবিয়িং কর্মী নিয়োগ, যাঁদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ নিয়োগ ও পদায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করা এবং প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
প্রতিনিধিদল আরও তুলে ধরে যে, কিশোরী ও নারীদের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে তাঁদের মর্যাদা সুরক্ষিত থাকবে এবং ভৌগোলিক অবস্থান কিংবা আর্থসামাজিক পরিস্থিতি নির্বিশেষে মানসম্মত সেবা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের মূল অধিবেশনগুলোর পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন স্বাস্থ্য ও উদ্ভাবনবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কৌশলগত বৈঠক করে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল বায়ার, রোশে, বার্লিন ইনস্টিটিউট অব হেলথ এবং শারিতে-
ইউনিভার্সিট্যাটসমেডিসিন বার্লিন।
শারিতে পরিদর্শনকালে নারীস্বাস্থ্য ও স্ত্রীরোগ ক্যানসার চিকিৎসা নিয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় হয়। বিশেষায়িত চিকিৎসায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ক্যানসারসেবায় সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র নিয়েও আলোচনা হয়।
বাংলাদেশের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো এসব অঙ্গীকারকে সহজলভ্য, মানসম্মত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবায় রূপান্তর করা, বিশেষ করে সেই সব নারী ও কিশোরীর জন্য, যাঁরা স্বাস্থ্যসেবা পেতে সবচেয়ে বেশি বাধার মুখোমুখি হন।
ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক, ইউএনএফপিএ, ইউরোপের স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠান এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে এ অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে চায় বাংলাদেশ।
বার্লিনের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলন থেকে উঠে আসা বার্তাটি স্পষ্ট—নারীস্বাস্থ্যের উন্নয়ন কেবল স্বাস্থ্য খাতের অগ্রাধিকার নয়; এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহনশীলতা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য আরও নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।