ঢাকা, ৪ নভেম্বর, ২০২৬ : স্বাধীনতার পর ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ না করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল নীতি অনুসরণ করায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারের সুযোগ হারিয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী।
আজ বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আয়োজিত ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী এক দশকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির তুলনামূলক পর্যালোচনা’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর নতুন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে যেসব দেশ স্বীকৃতি দিয়েছিল, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। সঠিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ না করায় বিদেশি অনেক সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়। নতুন রাষ্ট্র হিসেবে এর প্রভাব মোকাবিলা করতে না পেরে বাংলাদেশ দুর্ভিক্ষসহ বিভিন্ন সমস্যার মুখে পড়ে।
তিনি বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী দশকের দ্বিতীয় ভাগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নেন এবং দেশের বিপুল শ্রমশক্তির জন্য বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ করেন। শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে গণতন্ত্রের অবনতি ও বাকশাল প্রতিষ্ঠা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জিয়াউর রহমানের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পররাষ্ট্রনীতি যেন কেবল নেতানির্ভর না হয়ে গবেষণানির্ভর হয়, সে লক্ষ্যে তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার পথ তৈরি হয়।
আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ড. মো. আব্দুল মান্নান বলেন, মুক্তিযুদ্ধে ভারত তার কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায় বাংলাদেশকে সহায়তা করেছিল। তবে ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচারে এমন ধারণা দেওয়া হতো যে ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীনতা উপহার দিয়েছে। তার মতে, এ ধরনের বক্তব্য মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানকে খাটো করে।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে একটি মুসলিম দেশ বিভক্ত হওয়ার ফল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। একই সময়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব অবস্থান প্রতিষ্ঠা করাও চ্যালেঞ্জের ছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের সময় অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতি সেই চ্যালেঞ্জ আরও বাড়িয়ে দেয়।
জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র অবস্থান প্রতিষ্ঠায় জিয়াউর রহমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহসান মাহমুদ বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী এক দশকের পররাষ্ট্রনীতি পর্যালোচনায় শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের শাসনামল বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। শেখ মুজিবুর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সে সময়ের নাগরিকদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। তাদের ধারণা ছিল, পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ ভারতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান শিক্ষার্থীদের সমুদ্রসীমা সম্পর্কে ধারণা দিতে ‘হিজবুল বাহার’ জাহাজে করে সমুদ্র ভ্রমণের আয়োজন করতেন। এর মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করেছিলেন।
লেখক ও গবেষক তুহিন খান সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন। এতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, আইনজীবী, শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।







